নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পাহাড় থেকে কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত অনেকটা ‘তরল কংক্রিটের’ মতো নিচের দিকে নেমে আসায় মুহূর্তের মধ্যেই তলিয়ে যায় বাড়িঘর, সড়ক ও যানবাহন। এমন পরিস্থিতিতে আগাম সতর্কতা পাওয়ার পরও দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বুধবারের এই দুর্যোগের সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের জটিল ও অস্থিতিশীল ভূপ্রকৃতির কারণে এ অঞ্চলে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেশি।
ভূমিকম্প নয়, ভূমিধস থেকেই ভূকম্পন?
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল প্রাথমিকভাবে ধারণা করেছিলেন, ভূমিকম্পের কারণে ভূমিধসের ঘটনা ঘটতে পারে। ভূমিধসের ফলে একটি নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে প্রাকৃতিক বাঁধের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে সেই বাধা ভেঙে বিপুল পানির স্রোত নিচের দিকে নেমে আসে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূকম্পন শনাক্ত হয়েছিল। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, ওই ভূমিকম্পের কারণেই ভূমিধস হয়েছে। তবে পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরং ভূমিধসের কারণেই সেখানে ভূকম্পনের সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) প্রাথমিক মূল্যায়নেও সীমান্তের চীনা অংশে বড় ধরনের অস্বাভাবিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির বিশেষজ্ঞদের ধারণা, নেপাল অংশে পাথুরে বরফধসের ফলে লেন্দে নদীর গতিপথ আটকে গিয়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।
বৃষ্টিপাত কম হলেও ভয়াবহ বন্যা
এই দুর্যোগের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, ঘটনার আগে ঘটনাস্থল ও আশপাশে উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটি সান আন্তোনিওর জলবিজ্ঞানী হাতিম শরিফের মতে, এমন ঘটনা প্রচলিত বন্যা সতর্কতা ব্যবস্থাকেও কার্যত অকার্যকর করে দিতে পারে।
তীব্র গতিতে পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা-পানির ঢল এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, মানুষ কিংবা গাড়িতে করে পালানোর সুযোগ খুব কম ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত সম্ভব হলে উঁচু স্থানে উঠে যাওয়াই প্রাণ বাঁচানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডরোথি হাইনরিখ বলেন, হিমালয়ের অনেক এলাকায় নদীর গতিপথ সংকীর্ণ। তুষারধস বা ভূমিধসে নদীর পথ আটকে গেলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পানি জমে যেতে পারে। পরে সেই বাধা ভেঙে ভয়াবহ পানির ঢল সৃষ্টি হতে পারে।
আবারও ঢলের আশঙ্কা
বিশেষজ্ঞরা এখনো পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ মনে করছেন না। আইসিআইএমওডির জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং জানিয়েছেন, উজানে নদীর গতিপথের কিছু অংশ এখনো আটকে থাকতে পারে। ফলে পরবর্তী সময়ে আবারও বড় ধরনের পানির ঢল নামার আশঙ্কা রয়েছে।
এ কারণে নদীর তীরবর্তী ও নিচু এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কতটা?
এই দুর্যোগের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে আগামী দিনগুলোতে বিজ্ঞানীরা বিস্তারিত গবেষণা করবেন।
হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের দ্রুত সরে যাওয়া এবং স্থায়ী বরফ গলে যাওয়ার কারণে হিমবাহের হ্রদ ও পাহাড়ি ভূমির স্থিতিশীলতায় পরিবর্তন ঘটছে। এসব পরিবর্তন ভবিষ্যতে ভূমিধস ও হিমবাহ-হ্রদ থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার (GLOF) ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিজ্ঞানীরা ‘অ্যাট্রিবিউশন স্টাডি’র মাধ্যমে খতিয়ে দেখবেন, বর্তমান উষ্ণ জলবায়ুর কারণে এ ধরনের দুর্যোগের সম্ভাবনা কতটা বেড়েছে। একই সঙ্গে শিল্পবিপ্লবের আগের জলবায়ুর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করা হবে।
তবে আপাতত বিশেষজ্ঞদের প্রধান উদ্বেগ হলো—উজানে কোথাও পানি বা নদীর প্রবাহ আটকে থাকলে তা নতুন করে ভয়াবহ ঢলের সৃষ্টি করতে পারে। তাই নেপালের দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি নতুন দুর্যোগের আশঙ্কায় সতর্কতা জোরদার করা হচ্ছে।
মোছাঃ নাজমুন নাহার রুমকী 









